মৃত্যুর পর দেহে কি ঘটে?

প্রবাদ আছে পৃথিবীতে কোন কিছুই অবধারিত নয়; মৃত্য এবং ট্যাক্স ব্যাতিত। কিছু মানুষ বিভিন্ন ছলা কৌশল করে ট্যাক্স ফাঁকি দিতে সক্ষম হলেও কেউ মৃত্যুকে ফাঁকি দিতে পারেনা। আল্লাহ রাববুল আলামীন কুরআনে কারীমে ইরশাদ করেন- “তোমরা যেখানেই থাক না কেন; মৃত্যু কিন্তু তোমাদেরকে পাকড়াও করবেই। যদি তোমরা সুদৃঢ় দূর্গের ভেতরেও অবস্থান কর, তবুও।…” -(সূরা আন নিসা, আয়াত: ৭৮)

কিন্তু আপনি কি কখনো ভেবেছেন আপনার মৃত্যুর পর আপনার শরীরের কী হবে? পুরো ব্যাপারটা কিছুটা শ্রুতিকটুএ হলেও খুব ইন্টারেস্টিং। তো চলুন, মৃত্যুকে আমরা সাইন্টিফিক পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে জানি।  

আপনার মৃত্যুর পর আপনার হৃদপিণ্ড রক্ত পাম্প করা বন্ধ করে দেবে। এর ফলে আপনার শরীরের কোষগুলোতে অক্সিজেনর ঘাটতি দেখা দেবে। কোষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন অক্সিজেন এবং যখন কোষ অক্সিজেন না পায় তখন এটি ভাঙতে শুরু করে এবং কোষের প্রকৃতি অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন সময়ে অকার্যকর হতে শুরু করে।
যেমনঃ ব্রেইনের কোষ মানুষের শেষ নিঃশ্বাস গ্রহণের কয়েক মিনিটের মধ্যেই মারা যায়। অপরদিকে ত্বকের কোষ মৃত্যুর ২৪ ঘন্টার পরো বেঁচে থাকতে পারে।   

অক্সিজেনের অনুপুস্থিতে মৃতদেহে অতিরিক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড জমতে শুরু করে এবং এর ফলে মৃতদেহে এসিডিক পরিমণ্ডল তৈরী হয়। এই এসিডিক পরিমণ্ডল দেহের কোষগুলো স্ফোটনের জন্য ঝিল্লি তৈরী করে। এই ঝিল্লিগুলো একপ্রকার এনজাইম রিলিজ করে যা দেহের কোষগুলোকে ভেতর এবং বাহির থেকে হজম করতে শুরু করে। এটা হচ্ছে মানব দেহ পচনের প্রথম পর্যায়, এটাকে অটোলাইসিস বা কোষ-স্ববিনাশ বলা হয়।

আপনি যদি কোন মৃত মানুষ দেখে থাকেন তাহলে লক্ষ্য করবেন যে মৃতদেহের ত্বক বিবর্ণ দেখায়। এর কারণ, রক্ত সঞ্চালন ত্বককে এর রঙ বজায় রাখতে সহযোগীতা করে। যখন দেহে রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হয়ে যায় ত্বকে বিবর্ন আভা তৈরি হতে থাকে।  

হৃদস্পন্দন বন্ধ হবার সাথে সাথেই শরীরের তাপমাত্রা নষ্ট হতে শুরু করে; প্রতি ঘন্টায় প্রায় ১.৫° ফারেনহাইট (০.৮৩° সেলসিয়াস) করে যতক্ষন না এটি রুমের তাপমাত্রায় পৌছায়। এই অবস্থাকে বলা হয় ডেথ চিল।   

মৃত্যুর প্রায় ৩ ঘন্টা পর শরীরের কাঠিন্যতা তৈরি হতে শুরু করে। সে সময়টাতে মৃত ব্যাক্তির অঙ্গসমূহ নড়ানো চড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে। এই কাঠিন্যতা শুরু হয় চোখের পাতায়, চোয়ালে এবং ঘাড়ের পেশীতে।  

যখন এতোসব চিত্তাকর্ষক ব্যাপার ঘটে যাচ্ছে তখন সম্ভবত সবচাইতে ইন্টারেন্সটিং ব্যাপার হচ্ছে শরীরের অভ্যান্তরিন পচন। আমাদের শরীরের বাস করে বিপুল সংখ্যক ব্যাক্টেরিয়া। মৃত্যুর পর যখন সারা দেহের কোষগুলো মারা যায়, অন্ত্রের ব্যাক্টেরিয়া গুলো তখনো বেঁচে থাকে। শরীর যখন পচতে শুরু করে তখন সেসব ব্যাক্টেরিয়া সক্রিয় হয়ে উঠে, শরীরের ভেতর থেকে পচনকৃত মৃতদেহেকে হজম করতে শুরু করে। যখন জীবাণুরা কাজ চালিয়ে যেতে থাকে, অন্ত্রে গ্যাস জমা হতে শুরু করে এবং পারিপার্শ্বিক টিস্যুগুলো প্রসারিত হতে শুরু করে। ভেতরের অংগসমূহ ভেঙ্গে তরল এবং গ্যাসে রুপান্তরিত হয় এবং এদের গঠনে শরীর স্ফীত হতে শুরু করে। এই পর্যায়ে শরীরের সকল ছিদ্রপথ দিয়ে তরল বের হয়ে আসতে শুরু করে এবং গ্যাস ত্বককে বিদীর্ণ করে দিতে পারে।

মৃত্যুর এক সপ্তাহ পর, শরীরের ত্বকে এতোটাই ফোস্কা পড়তে শুরু করে যে সামান্য স্পর্শেই মাংস খয়ে আসতে পারে। আবশ্যিকে ভাবেই ব্যাপারটা কীটপতঙ্গ এবং অন্যান্য প্রাণীর নজরে আসে। পোকামাকড় ও শূককীট ভোজন শুরু করে দেহের আরো ভাঙনে সহায়তা করে। ত্বক স্ফীত হবার পাশাপাশি কালচে হয়ে যায় এবং শরীরের পদার্থের ভাঙনে দুর্গন্ধ তৈরি হয়।

এরপরে আসে সক্রিয় অবক্ষয়ের। মৃত্যর প্রায় ২৫-৫০ দিনের মধ্যে শূককীট ও অন্যান্য পোকামাকড় দেহের কোমল টিস্যু, ত্বক এবং চুলের পরিপূর্ণ ভাঙন সম্পন্ন করে, একই সাথে পেশী এবং যোজক টিস্যুকেও। শরীর ভেঙ্গে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জৈবিক পদার্থে পরিণত হয় যতক্ষন না পর্যন্ত সব নিশ্বেষিত হয়ে শুধুমাত্র কঙ্কাল অবশিষ্ট থাকে এবং অনেক অনেক বছর পর সেগুলোও একসময় নিশ্বেষিত হয়ে যায়।  

আপনার শরীর তার প্রকৃতিতে থেকে যায় এবং অন্য জীবের জন্য ফুয়েল হিসেব ব্যবহৃত হয় এবং তাদের শরীরও মৃত্যুর পর প্রকৃতিতে একই ভূমিকা পালন করে। জীবনের এই প্রক্রিয়া অবিরাম চলতেই থাকে।

Related Post

Leave a Comment