শাহ্রুখ খানের সাফল্যের গল্প

ভারতীয় সিনেমা জগতের এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক হলেন কিং অফ বলিউড খ্যাত অভিনেতা শাহরুখ খান | একসময় দিল্লীর এই সাধারণ ছেলে যাকে কেউ চিনতো না এবং জানতোও না; আজ সে এতটাই জনপ্রিয় যে তাকে শুধু ভারতের মানুষরাই নয়, সারাবিশ্বের মানুষরাও চেনে তার অসাধারণ এক্টিং স্কিলের সুবাদে| এছাড়াও কঠিন পরিশ্রম আর কাজের প্রতি গভির আগ্রহের জন্য মধ্যবিত্ত পরিবারের হয়েও আজ গোটা বিশ্ব তাকে কিং খান নামে চিনেন । তিনি একাধারে একজন বিজনেসম্যান ,পরিচালক এবং কলকাতা নাইট রাইডারস এর গর্বিত মালিক।

শাহরুখ খান এতদিনে ৮০টারও বেশি সিনেমা করে ফেলেছেন বলিউডে এবং ১৪টা Flimfare পুরস্কারও জিতে ফেলেছেন | সেইসাথে তিনি হয়েছেন বিশ্বের সবচেয়ে ধনী অভিনেতাদের মধ্যেও একজন |

২রা নভেম্বর ১৯৬৫ সালে,  নয়া দিল্লিতে শাহরুখ খানের জন্ম হয় | কিন্তু জীবনের প্রথম পাঁচ বছর তিনি ভারতের ম্যাঙ্গালোর শহরে কাটান, নয়া দিল্লিতে নয় |তার বাবা মীর তাজ মোহাম্মদ ছিলেন একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং মা লতিফ ফাতিমা ছিলেন একজন সাধারণ গৃহবধু | তাদের আদি বাসস্থান ছিলো বর্তমান পাকিস্তানের পেশোয়ার শহরে | কিন্তু দেশভাগের সময় তারা পরিবার সহ ভারতে চলে আসেন এবং নয়া দিল্লিতে বসবাস করা শুরু করেন |

পরিবারের আর্থিক সমস্যা দূর করার জন্য তার বাবা মীর তাজ মোহাম্মদ একটা খাবারের দোকান দেন এবং সেখান থেকে উপার্জিত পয়সায়, তিনি তার ছেলেকে দিল্লীর একটা নামী স্কুলে ভর্তিও করেন| শাহরুখ খানের প্রাথমিক শিক্ষাজীবন, দিল্লীর সেন্ট কলম্বাস স্কুল থেকে শুরু হয় | সেই স্কুলের তিনি একজন মেধাবী ছাত্র ছিলেন | পড়াশোনায় ভালো হওয়ার পাশাপাশি তিনি খেলাধুলাতেও ছিলেন অসাধারণ এবং স্কুলের হয়ে হকি ও ফুটবল খেলতেন | পড়াশোনায় দারুন সাফল্যের জন্য, তিনি একবার সেই স্কুলের সর্বোচ্চ পুরুস্কার Sword of Honor পদে সম্মানিতও হন |

সেইসময় তার জীবনের লক্ষ্য ছিলো, বড় হয়ে একজন খেলোয়াড় হওয়ার | দিনরাত তিনি সেটারই স্বপ্ন দেখতেন এবং সেইসাথে খেলাধুলার পিছনে পরিশ্রমও করতেন | কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে, তিনি সেই স্বপ্নকে কোনোদিনই পূরণ করতে পারেননি, কারণ একটা দুর্ঘটনায় তার কাঁধে বড় ধরনের চট লাগে এবং তাকে খেলাধুলা সারাজীবনের জন্য ছেড়ে দিতে হয় |

শাহরুখ খানের Alltime Favorite ভারতীয় অভিনেতারা হলেন- দিলীপ কুমার, অমিতাভ বচ্চন এবং মুমতাজ | এনাদের অভিনয় দেখেই তিনি জীবনে অনেক কিছু শিখেছেন এবং  তার অভিনয় জগতে আসার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণাও ছিলেন এই তিন ব্যক্তিত্ব, যা তিনি আজও স্বীকার করেন |

দিল্লীর হান্সরাজ কলেজ থেকে ইকনমিক্সে গ্র্যাজুয়েট হওয়ার পর তিনি কিন্তু সেই বিষয়ে আর বেশিদূর এগোননি | কারণ বেশিরভাগ সময় তার সময় কাটতো দিল্লীর থিয়েটার অ্যাকশন গ্রুপে | সেখানে তিনি বেশিরভাগ সময়ই নিজের অভিনয় দক্ষতাকে improve করতে কাটিয়ে দিতেন |

 

অভিনয় জীবনঃ
১৯৮৮ সালে প্রথমবারের জন্য শাহরুখ খান টেলিভিশন জগতে আত্মপ্রকাশ করেন | লেখ ট্যান্ডন প্রযোজিত টেলিভিশন সিরিজ “দিল দরিয়াতে” তিনি প্রথমবার অভিনয় করেন | কিন্তু সেই টেলিভিশন সিরিজ, কিছু প্রোডাকশন জনিত সমস্যার জন্য এক বছর পর শুরু হয় |

এই এক বছরের সময়ের ব্যবধানে তিনি আরো একটি টেলিভিশন সিরিজের সাথে যুক্ত হন যেটার নাম ছিলো “ফৌজী” | সেখানে তিনি কমান্ডো অভিমন্যু রাইয়ের চরিত্রে অভিনয় করেন | যদিও সেটা তার দ্বিতীয় টেলিভিশন সিরিজ ছিলো কিন্তু হিসাবমতো সেই সিরিজেই শাহরুখ খানের প্রথমবারের জন্য আত্মপ্রকাশ ঘটে |

এই দুটো টেলিভিশন সিরিজ ছাড়াও তিনি আরো অনেক টেলিভিশন সিরিজ করেন | সেইগুলোর মধ্যে জনপ্রিয় কিছু হলো- সার্কাস (১৯৮৯-১৯৯০), ইডিয়ট (১৯৯০), উমিদ (১৯৮৯), ওয়াগলে কি দুনিয়া (১৯৮৮-১৯৯০) প্রভৃতি |

এরপর টেলিভিশন জগতে দুর্দান্ত সাফল্যের পর তার কাছে বলিউড থেকে অফার আশা শুরু হয় | তার কাছে প্রথম অফার আসে হেমা মালিনীর তরফ থেকে, যিনি কিনা পরিচালক হিসাবে তার প্রথম সিনেমা “দিল আশনা হের” জন্য তাঁকেই পছন্দ করেন একজন মুখ্য চরিত্র হিসাবে | কিন্তু সেই সিনেমা তেমন জনপ্রিয়তা পায়নি |

হিসাব মতো দেখতে গেলে তার প্রথম ডেবিউ সিনেমা হলো “দিওয়ানা”, যেটা ১৯৯২ সালে প্রকাশ পেয়েছিলো | সেই সিনেমায় মুখ্য দুই চরিত্র ছিলেন ঋষি কাপুর ও দিব্যা ভারতী কিন্তু তবুও সিনেমায় তার চরিত্রও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো |

সেইবছর “দিওয়ানা” বক্স অফিসে রেকর্ড গড়ে দেওয়ায় এবং ব্লক বাস্টার সিনেমা হিসাবে পরিচয় পাওয়ায়, শাহরুখ খানও রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে যান | সেই সিনেমায় তার দুর্দান্ত অভিনয়, মানুষকে পুরোপুরি মুগ্ধ করে দিয়েছিলো |

ব্যাস! তারপর থেকে তাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি | এরপর একের পর এক সিনেমার অফার আর সেইসাথে সাফল্যও আসতে শুরু করে দেয় তার কাছে | জীবনের প্রথম সিনেমায় দারুন অভিনয় করার জন্য তিনি আন্তর্জাতিক  Filmfareঅনুষ্ঠানে Best Male Debut পুরস্কার পান |

একটা কথা আমদের অনেকেরই হয়তো অজানা,  প্রাথমিক পর্যায়ে যখন তিনি বলিউডে একজন অভিনেতা হিসাবে যোগদান করেন, তখন তিনি কিন্তু বেশ কিছু বছর সিনেমায় খলনায়কের চরিত্রে অভিনয় করেন | প্রথম থেকেই তিনি কিন্তু হিরো হিসাবে অভিনয় করতেন না |

খলনায়ক হিসাবে বলিউডে তার বিখ্যাত কিছু সিনেমা হলো- ডর (১৯৯৩), বাজিগার (১৯৯৩) এবং আনজাম (১৯৯৪) |

এরপর তিনি অবশেষে রোমান্টিক হিরো হিসাবে কাজ করার জন্য বেশ কিছু সিনেমার অফার পান | যারমধ্যে জনপ্রিয় তার কিছু সিনেমা হলো- দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে (১৯৯৫), দিল তো পাগাল হে (১৯৯৭), কুছ কুছ হোতা হে (১৯৮৮), কাভি খুশি কাভি গম (২০০১) প্রভৃতি |

এছাড়াও তিনি দেবদাস সিনেমায় (২০০২) একজন নেশায় আসক্ত ব্যক্তি, স্বদেশ সিনেমায় (২০০৪) নাসার একজন বিজ্ঞানী, চক দে ইন্ডিয়া সিনেমায় (২০০৭) একজন হকি প্রশিক্ষক এবং মাই নেম ইজ খান সিনেমায় একজন এস্পের্গের সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তি হিসাবে অভিনয় করে ভারতীয় দর্শকদের মনে জায়গা করে নেন |

২০১৫ সালে শাহরুখ খান ভারতের মোশান ছবি নির্মাতা কোম্পানি “রেড চিলি এন্টারটেনমেন্টের” সহ-সভাপতি হিসাবে যোগদান করেন এবং তাদের সাথে মিলে দারুন কিছু সিনেমা উপহার দেন দর্শকদের |

এছাড়াও তিনি ২০০৮ সালে আইপিএলের জন্য কোলকাতা নাইট রাইডার্স নামে একটা দলও তৈরী করেন, যা পরবর্তীকালে ২০১২ এবং ২০১৪ সালে দুবার সেই টুর্নামেন্টের চ্যাম্পিয়ন দলও হয় |

শাহরুখ খানের আরেকটা সবচেয়ে বড় প্রতিভা হলো, তিনি দারুনভাবে যেকোনো শোয়ের হোস্ট করতে পারেন এবং সেই সাথে মানুষকে লাইভ হাসাতে পারেন |  যেটা অন্যান্য অনেক অভিনেতার পক্ষেই কঠিন একটা বেপার | তার এই প্রতিভার জন্য মিডিয়ার কাছে তিনি “ব্র্যান্ড এসআরকে” নামেও পরিচিত |

এইসব ছাড়াও অনেক স্বাস্থ্য সংস্থা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত হয়ে তিনি অনবরত জনগণের সেবা করে চলেছেন । তিনি জরুরি অবস্থাতেও অনেকবার মানুষকে সাহায্য করেছেন, এবং দরিদ্র ও অনাথদের শিক্ষার জন্যও অনেক অর্থও দান করেছেন | ২০০৪ সালে নিউজ উইক পত্রিকা, তাকে বিশ্বের 50 জন শক্তিশালী ব্যক্তিদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে ।

জীবনের অনেক চড়াই-উৎরাই পার করে এসেও অতীতকে ভুলতে পারেননি শাহরুখ। সে কারণেই তিনি প্রতিনিয়ত সাফল্য পেয়ে যাচ্ছেন। আর এত সাফল্যের জেরে ২০১০ সালে লন্ডনের মাদাম তুসোর জাদুঘরে শাহরুখের মোমের মূর্তি স্থাপন করা হয়। শুধু তাই নয়, তাকে ডক্টর ডিগ্রি দিয়েছেন ইংল্যান্ডের একটি বিশ্ববিদ্যালয়। তাছাড়া ফ্রান্সের একটি মুদ্রায় মুদ্রিত করা হয়েছে শাহরুখের ছবি। কোটি ভক্তের হৃদয়ে রাজত্ব করে যাচ্ছেন ছবির রাজ, রাহুল, আরিয়ান, বাদশাহ চরিত্রের শাহরুখ। ‘জনপ্রিয়’ বিশেষণের চেয়েও বেশি জনপ্রিয় কিং খান। তার অভিনীত ‘ফ্যান’ ছবির একটি ডায়লগই শুধু মানানসই তার ক্ষেত্রে। আর সেটি হলো ‘সে তারকা নয়, সে আমার দুনিয়া’। এ কথাটাই সব ভক্তরা প্রতি মুহূর্তে অনুভব করে।

“জাব তাক হ্যায় জান, এস.আর.কে রেহেঙ্গে কিং খান।”

 

 

Related Post

Leave a Comment