ধূমপান ছাড়তে পারেন আপনিও

ধূমপান নিয়ে বহুল প্রচলিত জোকসটা বোধহয় আমরা অনেকেই জানি- একটি সিগারেটের একপ্রান্তে থাকে আগুন আর অন্যপ্রান্তে থাকে একজন আহাম্মক!

না, এই ভিডিওর উদ্দেশ্য ধূমপায়ীদের হেয় করা নয়, বরং সবাইকে সচেতন করে তোলা। তাদের নিজের ও পরিবারের স্বার্থে, বৃহত্তর স্বার্থে তো বটেই। কারণ বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন ঘটে চলেছে অসংখ্য অকালমৃত্যু। বিশ্বজুড়ে দিন দিন অকালমৃত্যুর প্রধানতম কারণ হয়ে উঠছে এই ধূমপান।

একটি অনুসন্ধান মতে, বাংলাদেশে মোট জিডিপির এক শতাংশ খরচ হয় ধূমপানের পেছনে। বর্তমানে বিশ্বে প্রতিবছর ২০ লাখের অধিক লোক মারা যায় ধূমপানজনিত ক্যান্সারে। এর মধ্যে বাংলাদেশে মারা যায় বছরে ৫৭ হাজার। এক গবেষণায় জানা যায়, ধূমপান বন্ধ হলে বছরে নয় হাজার কোটি টাকা লোকসানের হাত থেকে রক্ষা পাবে বাংলাদেশ। অন্যদিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রেহাই পাবে ধূমপানজনিত ক্যান্সারের হাত থেকে।

ধূমপান শুধু যে ধূমপায়ীর একার জন্যেই ক্ষতিকর তা নয়; বরং প্রত্যক্ষ ধূমপানের চেয়ে পরোক্ষ ধূমপান অনেক বেশি মাত্রায় ক্ষতিকর। জানেন। টাইম সাময়িকীর একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, যেসব শিশু স্কুলে যাওয়ার বয়স হওয়ার আগেই বাবা-মায়ের পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়, তাদের উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অধূমপায়ী বাবা-মায়ের সন্তানদের তুলনায় শতকরা ২১ ভাগ বেশি। এসব শিশু সারাজীবন ধরে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বয়ে বেড়ায়। সেইসাথে থাকে স্ট্রোক ও হৃদরোগের মতো প্রাণঘাতী রোগের শঙ্কা। আর শৈশব থেকেই যারা এমন বাড়তি রক্তচাপে ভোগে, পরবর্তীতে তাদের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি এমনিতেই অনেক বেশি। তাই ধূমপানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্ষতি সম্বন্ধে আমাদের সচেতন হতে হবে এখনই।

ধূমপানের ক্ষতি শুধু এটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশেষত হৃদযন্ত্রের ওপর এর ক্ষতির পরিমাণ সীমাহীন। কারণ সিগারেটে থাকা নিকোটিন হৃৎপিণ্ডের করোনারি ধমনীকে ক্রমাগত সংকুচিত করে তোলে এবং বলা হয়ে থাকে যে, যাদের করোনারি হৃদরোগ রয়েছে তাদের আকস্মিক হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুর জন্যে কখনো কখনো একটি সিগারেটই যথেষ্ট। আর ধূমপায়ীদের হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুর আশঙ্কা অধূমপায়ীদের চেয়ে এমনিতেই ছয় গুণ বেশি।

ধূমপায়ীরা কি জানেন, সিগারেট ফুঁকে লম্বা সুখটানে তারা কী টেনে নিচ্ছেন? উত্তর হলো, প্রায় চার হাজার রকমের রাসায়নিক উপাদান। গবেষণায় দেখা গেছে যে, এর সবই স্বল্প এবং দীর্ঘমেয়াদে মানবদেহের জন্যে বিষাক্ত। তাই ‘সুখটানে বিষপান’ কথাটি সত্য বটে।

ধূমপানের কারণে ধেয়ে আসা নিশ্চিত বিপর্যয় এড়াতে ব্যক্তিপর্যায়ে আপনি কী করতে পারেন? আপনার ব্যক্তিগত সচেতনতা সামান্য হলেও ভূমিকা রাখতে পারে বিশ্বের পট পরিবর্তনে। আপনি যদি ধূমপায়ী হয়ে থাকেন তবে ধূমপান ত্যাগের মধ্য দিয়ে শুরু হতে পারে এ পরিবর্তনের সূচনা।

অনেকে বলেন, ‘ধূমপান ছেড়ে দেয়া খুব সহজ। কতবার ছাড়লাম! কিন্তু দিন কয়েক যেতে না যেতেই আবার ধরে ফেলি-সমস্যাটা সেখানেই!’ বাস্তবতা হলো-আপনি চাইলে জীবনের তরে ধূমপান ছেড়ে দিতে পারেন। শুধু আপনার ইচ্ছাশক্তিই এজন্যে যথেষ্ট।

ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগানোর জন্যে কিছু কৌশল অবলম্বন করতে পারেন আপনি। যেমন : আজকের পর থেকে ধূমপানকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে মনে করুন। তাই যখনই ধূমপান করতে ইচ্ছে হবে তখন সব কাজ বাদ দিয়ে আপনি ধূমপানের জন্যেই সময় বরাদ্দ করুন। সচেতন হোন কখন আপনি ধূমপান করেন। গল্প করতে করতে বা টিভি দেখতে দেখতে, হাঁটতে হাঁটতে কিংবা কোনো কাজ করতে করতে ধূমপান করবেন না।

ধূমপানের সময় পুরোটা মনোযোগ নিবদ্ধ করুন আপনার কাজটিতে। চোখ বন্ধ করে সুখটান দিন, কল্পনার চোখে দেখুন, সিগারেটের ধোঁয়া আপনার নাক দিয়ে শ্বাসনালী অতিক্রম করে ফুসফুসের ভেতরে প্রবেশ করছে। এবার অনুভব করুন-ধোঁয়াটা ক্রমশ একটি সাপের আকার নিচ্ছে এবং এ সাপটি ফুসফুসে গিয়ে ছোবল মারছে আর প্রতিটি ছোবলের সাথে ঢেলে দিচ্ছে নিকোটিন নামের বিষ।

অনুভব করতে চেষ্টা করুন-বিষাক্ত ছোবলে আপনার ফুসফুস যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। অনুভূতি না এলে বাস্তবে যন্ত্রণার অভিনয় করুন। পরের টান দিয়ে আবার একই অনুভূতি আনার চেষ্টা করুন। পুরো একটা সিগারেট শেষ করে আপনি আপনার অনুভূতি ডায়েরিতে লিখে রাখুন। এভাবে একদিন, দুই দিন, তিন দিন, বড়জোর এক সপ্তাহ; একসময় দেখবেন আপনার শরীর সিগারেট প্রত্যাখ্যান করবে। ধূমপান বর্জনের এটি অত্যন্ত পরীক্ষিত ও ফলপ্রসূ প্রক্রিয়া। গত দু-যুগে বহু মানুষ এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ধূমপানের মতো আত্মঘাতী অভ্যাস থেকে মুক্ত হয়েছেন।

এ-ছাড়াও মেডিটেশনের মাধ্যমে সিগারেট ছাড়তে পারেন আপনি। নিয়মিত মেডিটেশন বা ধ্যান করলে মনের ওপর আপনার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সহজ হবে, জাগ্রত হবে আপনার ইতিবাচক শক্তি। তখন যে-কোনো কাজ অনুসরণ বা বর্জন আপনার জন্যে হয়ে উঠবে অনেক সহজ।

সর্বগ্রাসী ধূমপান আসক্তি থেকে চিরতরে মুক্ত হওয়ার সংকল্পে আপনি এখন বদ্ধপরিকর। আপনি পারবেনই। আপনাকে আমাদের আগাম অভিনন্দন!

Related Post

Leave a Comment